শহরের এক কোণে একটা পুরোনো ঘড়ির দোকান ছিল। দোকানটার নামফলক এতটাই বিবর্ণ যে দূর থেকে বোঝাই যেত না, সেটা এখনও খোলা আছে।
লোকমুখে শোনা যেত, সেই দোকানে এমন একটি ঘড়ি আছে, যা সময় নয়—মানুষের জীবনের হিসাব মাপে।
নির্বাণ এসব গল্পে কখনও বিশ্বাস করত না। তবু এক বর্ষার বিকেলে অদ্ভুত এক কৌতূহল তাকে দোকানটার সামনে এনে দাঁড় করাল।
ভেতরে ঢুকতেই সে থমকে গেল।
দেওয়ালজুড়ে অসংখ্য ঘড়ি। প্রত্যেকটা টিকটিক করছে, অথচ একটাও একই সময় দেখাচ্ছে না। কোথাও সকাল, কোথাও বিকেল, কোথাও যেন সময় বহু আগেই থেমে গেছে।
কাউন্টারের পেছনে বসে থাকা বৃদ্ধ চোখ না তুলেই বললেন,
— “যাকে খুঁজতে এসেছ, সেই ঘড়িটা এখানেই আছে।”
নির্বাণ অবাক।
— “আপনি জানলেন কীভাবে?”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
— “যারা কৌতূহল নিয়ে আসে, তারা ঘড়ি কিনতে আসে না। উত্তর খুঁজতে আসে।”
কাঁচের আলমারি খুলে তিনি একটি কালো ডায়ালের হাতঘড়ি বের করলেন।
— “পরে দেখো।”
ঘড়িটা কব্জিতে পরতেই ডায়াল হালকা আলোয় জ্বলে উঠল।
একটি সংখ্যা ভেসে উঠল।
৪৬ বছর।
নির্বাণ খুলে আবার পরল।
সংখ্যাটা বদলাল না।
— “এটা কি আমার বয়স?”
— “না।”
— “তাহলে?”
বৃদ্ধ জানালার বাইরে ঝরে পড়া বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “মানুষের জীবনে সবচেয়ে দামি জিনিস সময় নয়… সময়ের ব্যবহার।”
— “মানে?”
— “সব প্রশ্নের উত্তর প্রথম দেখাতেই পেলে মানুষ আর কোনোদিন ফিরে আসে না।”
ঠিক তখনই দোকানের দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।
একজন বৃদ্ধ ভেতরে ঢুকলেন। ভেজা জামা, কাঁপা হাত আর বুকে আঁকড়ে ধরা ছোট্ট একটা কেকের বাক্স।
লজ্জিত গলায় বললেন,
— “একবার… আমিও কি ঘড়িটা পরতে পারি?”
বৃদ্ধ দোকানদার কোনো কথা না বলে ঘড়িটা তাঁর হাতে তুলে দিলেন।
ডায়ালে ভেসে উঠল—
২ মিনিট।
নির্বাণের বুক ধক ধক করে উঠল।
— “কাকু! এক্ষুনি হাসপাতালে চলুন!”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
— “না বাবা। আগে নাতনিটার জন্মদিনে কেকটা পৌঁছে দিই। গত বছর কথা রাখতে পারিনি। আজও না গেলে ও বিশ্বাস করবে—দাদু কথা রাখে না।”
নির্বাণ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।
সে নিজেই বৃদ্ধকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
বৃষ্টিভেজা গলি পেরিয়ে তারা পৌঁছাল ছোট্ট একটা বাড়িতে।
দরজা খুলতেই সাত-আট বছরের একটা মেয়ে চিৎকার করে উঠল,
— “দাদু!”
সে দৌড়ে এসে বৃদ্ধকে জড়িয়ে ধরল।
কেক কাটা হলো।
মোমবাতি নিভল।
ঘর ভরে গেল হাসিতে।
নির্বাণের চোখ হঠাৎ তাঁর কব্জির দিকে গেল।
ঘড়ির সংখ্যা বদলাচ্ছে।
২ মিনিট…
১৮ মিনিট…
৪ দিন…
৩ বছর…
১৭ বছর…
শেষে থেমে গেল—
৪৫ বছর।
নির্বাণ স্তব্ধ।
ফিরে এসে সে বৃদ্ধ দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল,
— “এটা কীভাবে সম্ভব?”
বৃদ্ধ এবার প্রথমবারের মতো একটু জোরে হাসলেন।
— “এই ঘড়ি মৃত্যুর সময় বলে না।”
— “তাহলে?”
— “এটা বলে, একজন মানুষ নিজের জন্য আর কতটা সময় বাঁচবে।”
নির্বাণ চুপ।
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন,
— “দুটি জীবন আছে। একটা, যা মানুষ নিজের জন্য বাঁচে। আরেকটা, যা সে অন্যের জীবনে রেখে যায়। প্রথমটার মেয়াদ শেষ হয়। দ্বিতীয়টার হয় না।”
নির্বাণ নিজের কব্জির দিকে তাকাল।
৪৬ বছর।
সংখ্যাটা কাঁপল।
৪৩…
৩৯…
৩৫…
শেষে থেমে গেল—
৩১ বছর।
— “আমারটা কমে গেল কেন?”
বৃদ্ধ বললেন,
— “কারণ আজ তুমি নিজের সময়ের একটা বড় অংশ একজন অচেনা মানুষের জন্য খরচ করেছ।”
— “তাহলে আমি তো হারলাম!”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
— “না। যে সময় শুধু নিজের জন্য জমিয়ে রাখা হয়, একদিন তা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যে সময় অন্যের জীবনে আলো হয়ে থাকে, তা কখনও হারায় না।”
নির্বাণ ঘড়িটা টেবিলের ওপর রেখে দোকান থেকে বেরিয়ে এল।
বৃষ্টি থেমে গেছে।
রাস্তার ধারে এক ছোট্ট ছেলে ভেজা ফুল বিক্রি করছে।
লোকজন পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে।
নির্বাণ ছেলেটার সব ফুল কিনে নিল।
ছেলেটা দৌড়ে রাস্তার ওপারে বসে থাকা তার অসুস্থ মায়ের হাতে টাকাগুলো তুলে দিল।
সেই দৃশ্য দেখে নির্বাণের মনে হলো—
একটা ছোট সিদ্ধান্তও হয়তো অনেকগুলো জীবনের সময় বদলে দিতে পারে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে বৃদ্ধের কণ্ঠ ভেসে এল—
— “এবার আর ঘড়ি দেখার দরকার নেই।
আজ থেকে সময় তোমাকে গুনবে না…
তোমার কাজকে গুনবে।”
নির্বাণ ফিরে তাকাল।
দোকানটা ছিল।
কিন্তু ভেতরে কেউ ছিল না।
শুধু টিকটিক শব্দে ভরে ছিল চারপাশ।
সে মৃদু হেসে হাঁটা শুরু করল।
সেদিন প্রথমবার তার মনে হলো—
মানুষের জীবন বছরের সংখ্যায় বড় হয় না।
বড় হয়, কতগুলো হৃদয়ে সে নিজের সময় রেখে যেতে পারে।
—written by ©thesudipbiswas



0 Comments
Please do not enter any spam link in the comment box