রিনার আলমারির ওপর রাখা ঘড়িটা আর সময় দেখায় না। কাঁচে সরু একটা ফাটল, যেন বহুদিনের জমে থাকা কষ্ট হঠাৎ একদিন মুখ দেখিয়েছে। কাঁটা দু’টো থেমে আছে বিকেল চারটেয়। ঠিক এই সময়টাতেই রিনার জীবনে সবকিছু থেমে গিয়েছিল।
অনেকে বলেছে,
“এত পুরনো জিনিস রেখে কী হবে? ফেলে দাও।”
রিনা কিছু বলেনি।
কিছু জিনিস ফেলা দেওয়া যায় না।
কিছু জিনিস ফেলে দিলে মানুষ নিজের একটা অংশ ফেলে দেয়।
এই চারটের সময়েই রিনার বাবা শেষবার ঘড়িটা হাতে নিয়েছিল।
সেদিনের বিকেলটা খুব সাধারণ ছিল। জানালার গ্রিল ছুঁয়ে রোদ মেঝেতে পড়ছিল। রিনার বাবা ঘড়িটা খুলে বসে ছিলেন। মুখে সেই চেনা শান্ত ভাব, যেন সময় তার কাছে কখনও তাড়া দেয় না।
রিনা পাশে বসে বই খুলে ছিল, কিন্তু পড়া হচ্ছিল না। হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, সময় যদি একদিন থেমে যায়, তাহলে কী হবে?”
বাবা হেসেছিলেন। খুব আস্তে বলেছিলেন, “সময় থামে না মা, মানুষ থেমে যায়। কষ্ট পেলে, কাউকে হারালে, ভয় পেলে মানুষ থেমে যায়।”
তখন রিনা বিষয়টা বুঝতে পারেনি। তখন তার পৃথিবীতে বাবা ছিল, বাড়ি ছিল, নিশ্চিন্ত বিকেল ছিল।
আজ আর সবকিছু নেই।
শুধু কথাগুলো রয়ে গেছে।
বাবা চলে যাওয়ার পর পুরনো বাড়িটা বিক্রি হয়ে যায়। এখন সে একা থাকে শহরের এক ভাড়াবাড়িতে। সকালে ভিড়ঠাসা বাস, অফিসের যান্ত্রিক কাজ, মানুষের মুখ; সবকিছুর মাঝেও সে ভীষণ একা।
কেউ আর বলে না,
“চা খেয়েছো, না খেলে চলো।”
তবু বিকেলের চা বানানোর সময়টা সে ছাড়ে না। এই সময়টুকুই তার নিজের। চায়ের কেটলি ওভেনের ওপর বসে। জল ফুটতে থাকে। সেই শব্দে রিনার ভালো লাগে; মনে হয় কেউ পাশে আছে।
সেদিনও তাই।
চায়ের কাপ নামাতে নামাতে হঠাৎ চোখ চলে গেল আলমারির ওপরের ঘড়িটার দিকে। থেমে থাকা কাঁটা দু’টো যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। নিঃশব্দে প্রশ্ন করছে, “আর কতদিন?”
রিনার বুকটা ভারী হয়ে এল।
ঠিক তখনই কলিং বেল।
চমকে উঠে দরজা খুলল সে। নিচতলার কাকু দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে ক্লান্তি, হাতে কাপড়ে মোড়া একটা পুরনো ঘড়ি।
কাকু বললেন, “মা, এই ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে। তোমার কাকিমণি বেঁচে থাকতে খুব যত্ন করত। ফেলে দিতে পারছি না। শুনেছি তুমি ঘড়ি সারাতে পারো।”
এই কথাটা শুনে রিনার বুকটা কেঁপে উঠল।
ঘড়িটা হাতে নিতেই সে বুঝল, এটা শুধু একটা যন্ত্র নয়; এটা কারও স্মৃতি। ঠিক যেমন তার নিজের ঘড়িটা।
টেবিলে বসে স্ক্রু খুলতে শুরু করল রিনা। আঙুলগুলো একটু কাঁপছিল। বাবার হাতের কথা মনে পড়ল। বাবা বলতেন, “যন্ত্রেরও মন আছে। জোর করলে ভেঙে যায়।”
ধীরে, খুব ধীরে কাজ করল সে।
হঠাৎ—
টিক…
তারপর—
টিক… টিক…
ঘড়ির কাঁটা নড়ল।
এই ছোট্ট শব্দে রিনার চোখ ভিজে গেল। কতদিন পর এই শব্দ শুনছে সে! যেন সময় আবার কথা বলতে শুরু করেছে।
কাকু অবাক হয়ে বললেন,
“চলেই উঠল! কত নেবে মা?”
রিনা মাথা নেড়ে বলল,
“কিছু না কাকু। সময়টা চলুক, এই তো চাই।”
কাকু চলে গেলে ঘরটা আবার চুপ করে গেল।
এই নীরবতা এবার আর ভয়ংকর লাগল না।
রিনা আলমারির ওপর থেকে নিজের ঘড়িটা নামাল। এতদিন সাহস হয়নি ছোঁয়ার। আজ আর সে ভয় পেল না।
ঘড়িটা খুলল। ধুলো জমে আছে। তবু ভেতরে সব ঠিক আছে। ঠিক যেমন সে নিজে ভাঙেনি, শুধু থেমে ছিল।
সময় লাগল। ধৈর্য লাগল।
অবশেষে—
টিক… টিক…
এই শব্দে রিনা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখের জল গড়িয়ে পড়ল।
ফিসফিস করে বলল,
“বাবা, আমি আবার চলতে শুরু করেছি।”
বাইরে সন্ধ্যা নামছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রিনা চায়ের কাপ হাতে তাকিয়ে থাকে। আকাশে অল্প আলো, অল্প অন্ধকার।
ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে।
আর রিনার জীবনও, ধীরে ধীরে আবার এগোচ্ছে।
-written by ©thesudipbiswas



0 Comments
Please do not enter any spam link in the comment box