এক কাপ চা আর তুমি

 



একটা শীতের বিকেল। রোদটা মিষ্টি গরম, পাড়ার ছোট্ট চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা কাপগুলো সারি সারি সাজানো। দোকানের কোণে বসে আছে রিমি — কলেজের ফাইনাল ইয়ারের মেয়ে, হাতে খাতা, চোখে একটু চিন্তার ছায়া।


অচিরেই একটা চেনা আওয়াজ —

“একটা চা, অল্প চিনি আর দুটো বিস্কুট!”


রিমি মুখ তুলে তাকাতেই দেখে অর্ণব — স্কুলের পুরনো বন্ধু, যার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল পাঁচ বছর আগে।


দুজনের চোখে সেই পুরনো চেনা হাসি।

রিমি বলে, “তুমি এখনো একই চা খাও?”

অর্ণব হেসে বলে, “তুমি এখনো বেশি কথা বলো?”


চায়ের কাপের ধোঁয়ায় ভেসে গেল সময়।

বেশ কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ — শুধু কাপের টুংটাং আওয়াজ আর হালকা হাওয়ায় উড়তে থাকা শুকনো পাতার শব্দ।


শেষে রিমি হালকা হেসে বলে,

“তোমাকে আবার দেখব ভাবিনি।”

অর্ণব বলে, “আমি ভেবেছিলাম… তুমি আমাকে ভুলে গেছো।”


রিমি হেসে চায়ের কাপটা অর্ণবের দিকে এগিয়ে দেয়,

“না, কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না, ঠিক যেমন চায়ের গন্ধকে।”


আর সেই বিকেলে, দোকানের বুড়ো চায়ের কেটলি যেন একটু বেশি গান গাইতে লাগল —

হয়তো বুঝে ফেলেছিল, একটা পুরনো গল্প নতুন করে শুরু হচ্ছে।


দু’মাস কেটে গেছে।


রিমি এখন অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত — সকাল থেকে মেট্রো, ট্রাফিক, মিটিং… কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যায়, অফিস থেকে ফেরার পথে, ওর চোখ অজান্তে খুঁজে ফেলে সেই চায়ের দোকানটাকে।


একদিন সাহস করে নেমে গেল।

দোকানের কোণে বসে বলল, “একটা চা, অল্প চিনি।”

দোকানদার হেসে বলে উঠল, “আজ আবার সেই পুরনো অর্ডার?”


রিমি চমকে গেল — অর্ণব বসে আছে ঠিক পাশের বেঞ্চে।

সে হেসে বলে, “তুমি এসেছো তো! ভাবছিলাম আজও হয়তো আসবে না।”


চায়ের ধোঁয়া দুজনের মাঝে নাচছিল।

রিমি বলে, “তুমি না, আমার মতো মানুষকে মনে রাখো?”

অর্ণব উত্তর দেয়, “তুমি মনে না থাকলে, এই দোকানটাই থাকত না।”


দুজনের হাসির ফাঁকে নরম করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল।

অর্ণব ছাতা খুলে বলে, “চলো, আজ একটু হাঁটা যাক।”


রাস্তায় দুজন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে কথা হচ্ছিল —

পুরনো ভুল, নতুন স্বপ্ন আর মাঝেমাঝে নীরবতা।


একসময় রিমি থেমে বলে,

“তোমার কি মনে হয়, পুরনো গল্পগুলো আবার নতুন করে লেখা যায়?” 

অর্ণব তাকিয়ে বলে,

“যদি চরিত্রগুলো একই থাকে, গল্প তো কখনো শেষ হয় না।”


রিমির মুখে হালকা হাসি —

“তাহলে, আমাদের গল্পটা আবার শুরু হোক?”

অর্ণব উত্তর দেয়, “এক কাপ চা দিয়ে।”


আর সেই বিকেলে, আকাশটা যেন হঠাৎ গোলাপি হয়ে উঠল। বৃষ্টির গন্ধে মিশে গেল চায়ের সুবাস,

আর দোকানের বুড়ো রেডিওতে ভেসে উঠল —

“তুমি আসবে বলে মন যে আজো পথ চেয়ে রয়…” 


সময় থেমে থাকে না।


অর্ণব এখন অন্য শহরে চাকরি পেয়েছে আর রিমি থেকে গেছে কলকাতায়। চায়ের দোকানটা এখনও আছে, কিন্তু আজকাল রিমি একাই বসে থাকে — সামনে দুটো কাপ, একটায় চা আর একটায় নীরবতা।


ফোনে মাঝে মাঝে কথা হয়,

অর্ণব বলে, “কাজের চাপ অনেক, চা খেতে সময় পাই না।”

রিমি মৃদু হেসে বলে, “তাহলে তোমার সেই চায়ের দোকান কে মনে রাখবে?”


একদিন হঠাৎ খবর এল — অর্ণব ফিরছে শহরে, অফিস বদলে গেছে।

রিমির মনে অজানা কাঁপন।

সেই বিকেলে, অনেকদিন পর চায়ের দোকানে গিয়ে বসে রইল।


ঠিক ছ’টা বাজে, দরজার পাশে কেউ বলল,

“একটা চা, অল্প চিনি আর দুটো বিস্কুট!”


রিমি মুখ তুলে তাকাল —

অর্ণব দাঁড়িয়ে, চোখে হাসি, হাতে এক প্যাকেট লাল গোলাপ।


“তুমি এসেছো?” — রিমির গলায় এক চিলতে কাঁপন।


অর্ণব বলল,

“হ্যাঁ, কারণ বুঝে গেছি — জীবন যতই ব্যস্ত হোক, এক কাপ চা যদি ভাগ করে খাওয়ার মানুষ থাকে, তবে সেই জীবনটাই সবচেয়ে মিষ্টি।”


রিমি চুপ করে শুধু হাসল।

চায়ের ধোঁয়া ধীরে ধীরে আকাশে মিলিয়ে গেল,

আর দোকানের পুরনো রেডিওতে ভেসে উঠল —

“এমন দিনে তারে বলা যায়…” 



চায়ের কাপ যেমন ঠান্ডা হয়, তেমনি সম্পর্কও থেমে যেতে পারে… কিন্তু যদি হৃদয়ে এখনও উষ্ণতা থাকে,

তবে একটা চায়ের দোকানই যথেষ্ট —

পুরনো ভালোবাসা নতুন করে গরম করে তোলার জন্য।


-written by ©thesudipbiswas





Post a Comment

0 Comments