স্টেশনের শেষ প্ল্যাটফর্মটা এখনও এক অদৃশ্য প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে। যেন প্রতিদিন সেই সন্ধ্যাবেলায়, যখন সূর্যটা ক্লান্ত হয়ে আকাশ থেকে নেমে আসে, তখন পাতার ফাঁক দিয়ে মেঘলার মুখটা কুয়াশার মতো ভেসে ওঠে।
অর্ণব এখন এক ব্যস্ত শহরের কর্পোরেট জগতে নামী এক্সিকিউটিভ। কাঁচের দেয়ালের অফিস, দামি ঘড়ি, গাড়ি, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত জীবন—সবই আছে ওর। তবু, সন্ধ্যার ছায়া পড়লেই একটা মুখ উঁকি দেয় ভিতর থেকে—চোখদুটো খুব পরিচিত, যেন থেমে থাকা সময়ের ভিতরে বসে থাকা কেউ।
ছ’বছর আগে, এই প্ল্যাটফর্মেই মেঘলার সামনে দাঁড়িয়েছিল অর্ণব। হাতে ব্যাগ, চোখে স্বপ্ন, কণ্ঠে উত্তেজনা।
“আমাকে যেতে হবে, মেঘলা। সুযোগটা হাতছাড়া করলে সারাজীবন আফসোস করব।”
মেঘলা চোখ মেলেছিল, শান্ত গলায় বলেছিল,
“আমি তোমাকে থামাতে চাই না অর্ণব। স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে না। কিন্তু একটা প্রশ্ন রাখি?”
“হ্যাঁ বলো…”
“তুমি ফিরবে তো?”
অর্ণব মুচকি হেসে বলেছিল,
“এই প্রশ্নটা করছো কেন? তুমি ভাবছো, আমি পালাচ্ছি?”
মেঘলা তাকিয়ে ছিল গভীর চোখে।
“না। আমি ভাবছি… তুমি হয়তো একদিন ফিরে এলেও, আমাদের জন্য আর ফিরবে না।”
ট্রেনের হুইসেল কানে ঢুকছিল, সময় ক্রমশ অচেনা হয়ে উঠছিল।
“আমার স্বপ্ন শেষ হলে, আমি ঠিক ফিরব। তখন আবার সব নতুন করে শুরু করব—তুমি , আমি, আমাদের একটা ছোট্ট বাড়ি।”
মেঘলা কিছু বলেনি। শুধু একটা ছোট্ট হাসি ফেলে বলেছিল, “আমি অপেক্ষা করব। কিন্তু জানো অর্ণব… সময় অপেক্ষা করে না, শুধু কিছু হৃদয় অপেক্ষা করেই থেকে যায়।”
ট্রেনটা চলে গিয়েছিল, মেঘলার হাতটা নেমে গিয়েছিল ধীরে ধীরে।
ছ’বছর পর, আজ অর্ণব সেই একই স্টেশনে দাঁড়িয়ে। বহু ট্রেন এসেছে, গেছে,
কিন্তু সেই মেঘলা… আর আসেনি।
স্টেশনের বেঞ্চে বসে থাকা এক বৃদ্ধ চা-ওয়ালাকে প্রশ্ন করেছিল অর্ণব, “একটা মেয়ে এখানে মাঝেমাঝে দাঁড়িয়ে থাকত… মেঘলা নামে। চেনেন?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়ল,
“অনেক বছর আগে একটা মেয়ে আসত ঠিক এই সময়টায়। দাঁড়িয়ে থাকত ওই দিকটায়, পেছন ফিরে তাকিয়ে তাকিয়ে। তারপর একদিন আর আসেনি। লোকমুখে শুনেছি, কোথাও চলে গেছে… খুব দূরে।”
অর্ণব এবার হেসে ফেলল।
না, আনন্দের হাসি নয়—কোনো কিছু হারানোর নীরব , ক্লান্ত হাসি।
চোখ মেলে তাকাল মেঘলার দাঁড়ানো জায়গাটায়।
একটা বাতি টিমটিম করে জ্বলছে।
হয়তো ওখানেই একদিন মেঘলা দাঁড়িয়ে ছিল—একটা শেষ প্রশ্ন নিয়ে…
“তুমি ফিরবে তো?”
অর্ণব তখন নিজেকেই প্রশ্ন করল—
“আমি তো ফিরেছি… তবু কেমন যেন কিছুই ফেরেনি।”
তার চোখ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল,
আর প্ল্যাটফর্মের বাতাসে মিলিয়ে গেল চুপচাপ বলে ফেলা শেষ কথাগুলো—
“আমি ফিরেও… ফিরে এলাম না।
“সব সময় ফেরা মানেই ফিরে আসা নয়। কিছু সময়, কিছু মানুষ, কিছু ভালোবাসা—একবার হারালে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ফিরে এসে তখন শুধু একটা প্রাক্তন স্টেশনে দাঁড়িয়ে বোঝা যায় — যে অপেক্ষা করেছিল, সে নেই, আর নিজের ভেতরকার মানুষটাও…কোথায় যেন হারিয়েগেছে”।
-written by ©thesudipbiswas
0 Comments
Please do not enter any spam link in the comment box